মরুভূমির সিংহ উমর মুখতার ও উপনিবেশবিরোধী প্রতিরোধের এক অমর অধ্যায়
04 অক্টোবর, 2026
Green Leaf BD
110 বার দেখা হয়েছে
ইতিহাসে কিছু মানুষ সেনাপতি হয়ে জন্মান না, পরিস্থিতি তাঁদের সেনাপতি বানিয়ে দেয়। উমর মুখতার তেমনই একজন। তিনি ছিলেন কুরআনের শিক্ষক, মরুভূমির পথঘাটে অভ্যস্ত এক সাধারণ বেদুইন আলেম। জীবনের প্রায় বিশটি বছর তিনি একটি আধুনিক ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে অসম লড়াই চালিয়ে গেছেন। তাঁর কাছে ছিল সীমিত অস্ত্র, পাহাড় আর মরুভূমির জ্ঞান। বিপরীতে ছিল বিমান, সাঁজোয়া যান, কামান এবং এমন এক ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র, যে সংকল্প করেছিল লিবিয়াকে ইতালির "চতুর্থ তীর" বানাতে।
এই প্রবন্ধে আমরা উমর মুখতারকে শুধু বীরগাথার নায়ক হিসেবে দেখব না। দেখব একজন কৌশলী প্রতিরোধ-নেতা হিসেবে, একটি ঔপনিবেশিক গণহত্যার সাক্ষী হিসেবে এবং স্মৃতির রাজনীতির এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবে।
প্রেক্ষাপট: লিবিয়া কেন ইতালির লক্ষ্য হলো
উনিশ শতকের শেষে "আফ্রিকার জন্য কাড়াকাড়ি"-তে দেরিতে নামা ইতালি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল ১৮৭০-এর দশকে। উপনিবেশ-দৌড়ে সে ছিল ব্রিটেন-ফ্রান্সের চেয়ে পিছিয়ে। ১৮৯৬ সালে আদোয়ার যুদ্ধে ইথিওপিয়ার হাতে পরাজয় তার জাতীয় অপমান হয়ে ওঠে। সেই ক্ষত সারাতে ইতালি উত্তর আফ্রিকার ওপর চোখ রাখে। ১৯১১ সালে সে অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন ত্রিপোলিটানিয়া ও সাইরেনাইকায় (বার্কা) আক্রমণ চালায়।
১৯১২ সালের উশি (লোজান) চুক্তিতে অটোমানরা সরে গেলে ইতালি ভেবেছিল যুদ্ধ শেষ। কিন্তু লিবিয়ার মানুষ নিজেদের ভূমিকে অটোমানদের সম্পত্তি ভাবেনি। বিশেষ করে সাইরেনাইকার সানুসি তরিকার অনুসারীরা প্রতিরোধ চালিয়ে গেল। ইতালি যে শুধু শহর দখল করেছিল, দেশ নয়, সেটা তারা অচিরেই টের পেল।
গঠনকাল: জাগবুবের মাদ্রাসা থেকে সীমান্তের যুদ্ধ
উমর মুখতার আনুমানিক ১৮৫৮ সালে পূর্ব লিবিয়ায়, তোবরুক অঞ্চলের কাছে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পিতাকে হারিয়ে তিনি সানুসি সম্প্রদায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বড় হন। জাগবুবের সানুসি শিক্ষাকেন্দ্রে বহু বছর পড়াশোনা করে তিনি ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের শিক্ষা পান। সানুসি আন্দোলন কেবল ধর্মীয় সংস্কারক ছিল না। এটি ছিল মরুভূমির উপজাতিগুলোকে সংগঠিত করা একটি সামাজিক-প্রশাসনিক কাঠামো। এখানেই মুখতার শিখেছিলেন গোত্রগুলোর সঙ্গে সংযোগ রাখা, বিবাদ মেটানো এবং আস্থা অর্জন করা। ভবিষ্যতের গেরিলা নেতার সবচেয়ে বড় পুঁজি এটাই।
ইতালির আগে তিনি আফ্রিকার অভ্যন্তরে, চাদ ও সুদানের দিকে ফরাসি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধেও সানুসিদের সঙ্গে লড়েছিলেন। অর্থাৎ ১৯১১-তে যখন ইতালি এল, মুখতার তখন প্রায় পঞ্চাশোর্ধ্ব, অভিজ্ঞ এবং যুদ্ধের বাস্তবতা সম্পর্কে অচেনা নন।
আন্দোলনের নেতৃত্ব: আদর্শিক শূন্যতা পূরণ
১৯২০-এর দশকের শুরুতে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। সানুসি প্রধান ইদ্রিস ইতালির সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন। ১৯২২ সালে ফ্যাসিস্ট শাসনের উত্থানের পর ইতালি আরও আগ্রাসী হয়, আর ইদ্রিস মিশরে নির্বাসনে যান। এই শূন্যতায় প্রতিরোধের মূল সামরিক দায়িত্ব এসে পড়ে মুখতারের কাঁধে। সাইরেনাইকার পাহাড়ি অঞ্চল জাবাল আখদারই (সবুজ পর্বত) হয়ে ওঠে তাঁর ঘাঁটি।
এখানে একটি বিশ্লেষণাত্মক পর্যবেক্ষণ জরুরি। মুখতারের শক্তি ছিল বিকেন্দ্রীকৃত সংগঠন। তিনি কোনো একক দুর্গ রক্ষা করেননি। ছোট ছোট চলমান দল, যাদের বলা হতো "আদওয়ার", স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় রসদ, খবর ও আশ্রয় পেত। ইতালীয় বাহিনী ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধে শক্তিশালী ছিল, কিন্তু এমন শত্রুর মুখোমুখি হলো যে আক্রমণ করে মিলিয়ে যেত, আবার ফিরে আসত। এটি গেরিলা যুদ্ধের কালজয়ী নীতি: জনগণই গেরিলার জলাশয়। মাও পরবর্তীকালে এই ভাষায় কথাটা বলেছেন, কিন্তু মুখতার তা বাস্তবে প্রয়োগ করেছিলেন তার আগেই।
ইতালির জবাব: গ্রাজিয়ানি, বেড়া ও ক্যাম্প
সামরিক পথে সমাধান না পেয়ে ইতালি যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিল। ১৯২৯ সালে পিয়েত্রো বাদোলিও গভর্নর হন, আর ১৯৩০ সালে রদলফো গ্রাজিয়ানি সাইরেনাইকার দায়িত্ব নেন। তাঁদের কৌশল ছিল গেরিলাদের নয়, গেরিলাদের সামাজিক ভিত্তিকে ধ্বংস করা।
প্রধান পদক্ষেপগুলো ছিল:
গণ-অন্তরীণ: সাইরেনাইকার গ্রামীণ ও যাযাবর জনগোষ্ঠীকে জোর করে বাড়িঘর থেকে সরিয়ে কাঁটাতারে ঘেরা ক্যাম্পে আটকানো হলো। আনুমানিক এক লক্ষের কাছাকাছি মানুষ এসব ক্যাম্পে ঢুকেছিল। ক্ষুধা, রোগ ও নির্যাতনে মৃতের সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের হিসাব ভিন্ন, তবে হাজার হাজার, অনেক হিসাবে চল্লিশ হাজারের বেশি। পশুসম্পদও ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়।
সীমান্ত-বেড়া: মিশর সীমান্ত বরাবর শতাধিক মাইল দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া তোলা হলো, যাতে মিশর থেকে রসদ ও অস্ত্র আসা বন্ধ হয়।
আকাশযুদ্ধ ও নিষ্ঠুরতা: বিমান থেকে নজরদারি ও বোমাবর্ষণ, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও ঐতিহাসিক গবেষণায় উঠে এসেছে।
এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের প্রথম দিকের নিয়মতান্ত্রিক "জনসংখ্যা-নিয়ন্ত্রণমূলক" যুদ্ধগুলোর একটি। এর লক্ষ্য ছিল যোদ্ধাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা, ফলে প্রতিরোধ শুকিয়ে যাবে। কৌশলগতভাবে এটি কাজ করেছিল, কিন্তু নৈতিকভাবে এটি ইতালির ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সবচেয়ে কালো দাগ।
পতন: সলুকের ফাঁসিকাষ্ঠ
১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বরে স্লন্তা অঞ্চলের কাছে এক সংঘর্ষে মুখতারের ঘোড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁকে আটকে ফেলে। ইতালীয় সৈন্যরা তাঁকে ধরে ফেলে। তখন তাঁর বয়স সত্তরের ঊর্ধ্বে। তাঁকে বেনগাজিতে এনে প্রহসনের বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর সলুকের ক্যাম্পে হাজার হাজার বন্দীর চোখের সামনে প্রকাশ্যে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ইতালি চেয়েছিল ঘটনাটি আতঙ্ক ছড়াক। বাস্তবে সেটি হয়ে উঠল এক অমোচনীয় প্রতীক।
তাঁর নামে প্রচলিত একটি উক্তি ("আমরা আত্মসমর্পণ করব না, আমরা জিতব অথবা মরব") বহুল প্রচারিত। তবে এর সূত্র ও সঠিক ভাষ্য নিয়ে নিশ্চয়তা কম, তাই এটিকে "তাঁর নামে প্রচলিত" বলাই নিরাপদ। ঐতিহাসিক সততার দাবি এটাই।
বিশ্লেষণ: মুখতারের প্রতিরোধ থেকে আমরা কী শিখি
এক. নৈতিক বৈধতার শক্তি। মুখতার কোনো রাষ্ট্র বা সুসংগঠিত সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি ছিলেন না। তাঁর ক্ষমতার উৎস ছিল জনগণের আস্থা। ভূমি, ধর্ম ও মর্যাদার প্রশ্নে তিনি আপসহীন ছিলেন বলেই মানুষ তাঁকে নেতা মানত।
দুই. সামরিক পরাজয় ও ঐতিহাসিক বিজয়ের পার্থক্য। মুখতার সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু ইতালির লিবিয়া-দখল বেশিদিন টেকেনি। ১৯৪৩ সালে ইতালি লিবিয়া হারায়, ১৯৫১ সালে লিবিয়া স্বাধীন হয়। ইতিহাস কেবল যুদ্ধের ফলাফলে নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিক স্মৃতিতেও লেখা হয়।
তিন. ঔপনিবেশিক সহিংসতার ঐতিহাসিক সত্য। ইউরোপের ইতিহাসচর্চায় দীর্ঘকাল ইতালির ঔপনিবেশিক নৃশংসতা, বিশেষ করে লিবিয়া ও ইথিওপিয়ায়, তুলনামূলক কম আলোচিত ছিল। ঐতিহাসিক আলি আবদুল লতিফ আহমিদা ও অন্যান্য গবেষকের কাজ এই নীরবতা ভাঙতে সাহায্য করেছে।
চার. অন্যান্য প্রতিরোধ-নেতার সঙ্গে তুলনা। আলজেরিয়ার আমীর আবদেল কাদের, মরক্কোর রিফ অঞ্চলের আবদুল করিম আল-খাত্তাবি এবং সুদানের মাহদির সঙ্গে মুখতারের মিল আছে। সবাই ধর্মীয় বৈধতা ও স্থানীয় সামাজিক কাঠামোকে সংগঠনের ভিত্তি করেছিলেন। পার্থক্য হলো মুখতার ছিলেন তুলনামূলকভাবে নির্বাসন-বিহীন, মাটির মানুষ। তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের ভূমিতেই ছিলেন।
স্মৃতির রাজনীতি: সিনেমা, মুদ্রা ও ক্ষমাপ্রার্থনা
মৃত্যুর পর মুখতার লিবিয়ার জাতীয় প্রতীকে পরিণত হন। লিবিয়ার ১০ দিনার নোটে তাঁর ছবি রয়েছে। ১৯৮১ সালে মুস্তাফা আক্কাদ পরিচালিত চলচ্চিত্র Lion of the Desert-এ অ্যান্থনি কুইন তাঁর চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি ইতালিতে দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ছিল এবং বহু বছর পরে, ২০০৯ সালে, সেখানে প্রদর্শিত হয়।
২০০৮ সালে ইতালি ও লিবিয়ার মধ্যে "বন্ধুত্ব চুক্তি" স্বাক্ষরিত হয়। এতে ইতালি ঔপনিবেশিক অতীতের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করে এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে সমালোচকরা বলেন, ক্ষতিপূরণের কাঠামো কতটা ন্যায়সংগত ছিল, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। আর স্মৃতির এই রাজনীতি কখনো কখনো শাসকদের আত্মপ্রচারেও ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন মুয়াম্মার গাদ্দাফির আমলে। তাই মুখতারকে স্মরণ করার সময় বীরত্ব ও রাজনৈতিক ব্যবহার, এই দুইয়ের পার্থক্য মনে রাখা জরুরি।
উপসংহার
উমর মুখতার আমাদের শেখান যে প্রতিরোধ শুধু অস্ত্রের গণনায় মাপা যায় না। এক শিক্ষক, এক বৃদ্ধ, কয়েক হাজার সংকল্পবদ্ধ মানুষ আর পাহাড়ি মাটির জ্ঞান নিয়ে একটি সাম্রাজ্যকে প্রায় দুই দশক আটকে রেখেছিলেন। ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কাছে তাঁর উত্তরাধিকার দুটি শিক্ষা রেখে যায়: আগ্রাসী শক্তি জনগণের অন্তর কেড়ে নিতে পারে না, আর ইতিহাস শেষ পর্যন্ত নির্যাতিতের পাশেই সাক্ষ্য দেয়।
তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল ১৯৩১ সালে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতেও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী সংগ্রামের সবচেয়ে সম্মানিত নামগুলোর একটি হিসেবে।