মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও নতুন সংঘাতের সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও নতুন সংঘাতের সমীকরণ
সামুদ্রিক অবরোধ থেকে সম্ভাব্য আকাশ হামলা:

ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা অষ্টম মাসে পদার্পণ করার মুহূর্তে অঞ্চলটিতে নজিরবিহীন সামরিক শক্তি বাড়াতে শুরু করেছে ওয়াশিংটন। পারস্য উপসাগরের কৌশলগত প্রণালিগুলোতে নৌ-অবরোধ এবং আকাশপথে সম্ভাব্য বিস্তৃত সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পদক্ষেপকে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষকরা।

অতিরিক্ত সেনাবেষ্টনী ও নৌ-বহরের বিস্তৃতি

পেন্টাগনের সামরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো থেকে 'ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট' ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এবং 'ইউএসএস মাকিন আইল্যান্ড'-এর নেতৃত্বাধীন উভচর বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। এ দুটি আন্তর্জাতিক স্ট্রাইক গ্রুপে প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার অতিরিক্ত সেনাসদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।
বর্তমানে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ইতোমধ্যে অবস্থান করছে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি শক্তিশালী রণতরি—'ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন' ও 'ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ'। নতুন বহরটি যুক্ত হলে অঞ্চলে মার্কিন বিমানবাহী রণতরির সংখ্যা দাঁড়াবে তিনে। এর ফলে প্রায় দেড় শতাধিক যুদ্ধবিমান, একাধিক নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ডেস্ট্রয়ার এবং প্রায় ২০ হাজার মার্কিন সেনা কেবল একটি ভৌগোলিক বেষ্টনীতেই অবস্থান নেবে। তবে অক্টোবর বা নভেম্বরের মাঝামাঝি এই পূর্ণাঙ্গ মোতায়েন শেষ হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

কৌশলগত চোকপয়েন্টে নতুন সংকট: হরমুজে ট্যাংকার বিপর্যয়

সামরিক এই চাপ বৃদ্ধির মধ্যেই লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের মাঝামাঝি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ 'স্ট্রেইট অব হরমুজ'-এ একটি ২৫ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতাসম্পন্ন সুপারট্যাংকারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য সংস্থা (UKMTO) জানিয়েছে, অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে এই দুর্ঘটনা ঘটলেও ঘটনার চূড়ান্ত দায় বা উৎসের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটির আকস্মিকতা পারস্য উপসাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং জ্বালানি রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিশ্বব্যাপী আশঙ্কাকে আরও উস্কে দিয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অনমনীয় অবস্থান ও থমকে যাওয়া কূটনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ আরও কঠোর করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রশাসন ও পররাষ্ট্র নীতি-নির্ধারকদের ভাষ্যমতে, তেহরানের সাম্প্রতিক শর্তযুক্ত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় ইরান হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে খুলে দেওয়ার বিনিময়ে নৌ-অবরোধ ও অর্থবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দাবি জানালেও ওয়াশিংটন তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। একইসাথে ইরানের রেখা ও শিল্প খাতের ওপর নতুন করে বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ জারি করে অর্থনৈতিক চাপ জোরদার করা হয়েছে। জবাবে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসনের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকলেও আলোচনা ও শান্তির পথ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে আসেনি।

বৈশ্বিক বার্তা: আলোচনার চাপ নাকি নতুন অভিযানের প্রস্তুতি?

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল সামরিক শক্তি প্রদর্শনকে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা যায়:
১. কৌশলগত লেভারেজ: ইরানের ওপর সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তাদের মার্কিন শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা।
২. দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধকৌশল: আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে সম্পূর্ণ পরাভূত করতে এবং সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক অভিযানের জন্য ভিত্তি তৈরি করা।

পেন্টাগনের এই বৃহৎ আকারের রণকৌশল কেবল আলোচনার টেবিলে প্রভাব বিস্তারের জন্য, নাকি মধ্যপ্রাচ্যকে আরও একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে—তার স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে আগামী কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক মোড় এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার পরিস্থিতির ওপর।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp