যুক্তরাজ্য বিমানঘাঁটিতে অন্তর্ঘাত চেষ্টা ইরানের বিরুদ্ধে লন্ডনের অভিযোগ ও তেহরানের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাজ্য বিমানঘাঁটিতে অন্তর্ঘাত চেষ্টা ইরানের বিরুদ্ধে লন্ডনের অভিযোগ ও তেহরানের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাজ্যের 'রয়্যাল এয়ার ফোর্স' (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে সন্দেহজনক তৎপরতাকে কেন্দ্র করে সরাসরি ইরানের দিকে আঙুল তুলেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম। তেহরান অবশ্য এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ঘটনাটিকে ঘিরে লন্ডন ও তেহরানের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ যেমন প্রকাশ্যে এসেছে, তেমনি খোদ পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যেও সমন্বয়হীনতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাজ্যের অভিযোগ ও প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য

বুধবার বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম দাবি করেন, সপ্তাহান্তে ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির ঘটনায় ইরানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা থাকার "জোরালো আলামত" পাওয়া গেছে। বিষয়টি স্পর্শকাতর ও জটিল হওয়ায় ব্রিটিশ পুলিশ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানান তিনি।

তবে ইরান সরকারের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ এখনো জনসম্মুখে আনেননি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি শুধু জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

ঘটনার নেপথ্যে যা ঘটেছে

গত রোববার ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির অদূরে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও বিস্ফোরক আইনের আওতায় বিশের কোঠার পাঁচ ব্রিটিশ তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আশপাশের কিছু পরিবারের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয় পুলিশ এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল অন্তত তিনটি ভ্যানে তল্লাশি চালায়।
মঙ্গলবার কাউন্টার টেররিজম পুলিশ নিশ্চিত করে যে ভ্যানগুলোতে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি; তবে কিছু পেট্রোল জব্দ করা হয়েছে। সন্দেহভাজনদের পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, লন্ডনের আনুমানিক ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিটি মার্কিন বোমারু বিমানগুলো নিয়মিত ব্যবহার করে আসছে। বিশেষ করে, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সংঘাত চরম আকার ধারণ করার পর থেকে এই ঘাঁটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। ইরান সরকারের 'ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর' (আইআরজিসি) আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল—তাদের সীমানায় হামলায় ব্যবহৃত যেকোনো বিদেশি সামরিক স্থাপনাকে তারা বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে।

পুলিশি তদন্ত ও নাটকীয় ফোনকল

যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ প্রধান লরেন্স টেইলর জানান, জামিন পেলেও আসামিরা নজরদারির বাইরে নন। অভিজ্ঞতার আলোকেই কৌশলী পদক্ষেপে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো—কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের ইন্ধনে এসব তরুণ জেনে বা না জেনে 'প্রক্সি' হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না।
এদিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গ্রেপ্তারের ঠিক আগমুহূর্তে জরুরি সেবায় কল এসেছিল। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন এটি কৌশলগত নজরদারি, নিরাপত্তা চাদর পরীক্ষার মহড়া, নাকি ব্রিটিশ প্রশাসনকে কোনো গোপন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা। ওই কলটি কারা করেছিলেন বা পুরোটাই তাদের মূল পরিকল্পনার অংশ ছিল—তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তেহরানের প্রতিক্রিয়া ও মার্কিন অসন্তোষ

ইরান এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ লেখেন, সন্দেহভাজন মূল ব্যক্তিদের জামিনে মুক্তি প্রমাণ করে ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ নেই। প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের উদ্দেশে তিনি মন্তব্য করেন, ব্রিটিশ সরকার আসল অপরাধী না খুঁজে ভুল পথে এগোচ্ছে।
অন্যদিকে, আসামিদের জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জামিনের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিষয়টিকে "অত্যন্ত উদ্বেগজনক" অভিহিত করে বলেন, আন্তর্জাতিক কোনো শক্তির ইন্ধন ছাড়া এমন ঘটনা ঘটা অসম্ভব।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে প্রধান সন্দেহভাজনদের জামিন পাওয়া ইঙ্গিত দেয় যে পুলিশ হয়তো প্রাথমিক অভিযোগে শক্ত তথ্যপ্রমাণ সাজাতে পারেনি। এছাড়া ইরানের জড়িত থাকার বিষয়টি এখনো কেবল ব্রিটিশ প্রশাসনের মৌখিক দাবির ওপর নির্ভর করছে; কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

উদ্ধার করা পেট্রোলের প্রকৃত ব্যবহার কী হতো, সন্দেহভাজনদের গোপন বার্তা কিংবা ফোনকলের পেছনে মূল উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো তদন্তাধীন। ফলে এটি কি সত্যিই রাষ্ট্র সমর্থিত কোনো ছদ্মবেশী অন্তর্ঘাতের চেষ্টা ছিল, নাকি নিছকই কোনো বিভ্রান্তি—তা নিশ্চিত হতে আরও কিছু সময়ের অপেক্ষা প্রয়োজন।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp