ভারতে ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ভাঙা ও মুসলিম বিশ্বের করণীয়

ভারতে ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ভাঙা ও মুসলিম বিশ্বের করণীয়
ভারতে একের পর এক ঐতিহাসিক মসজিদ ভাঙার ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সংবাদ নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এই উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে শতবর্ষী একটি মসজিদ ভাঙা হয়েছে, আর মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো শাহী মসজিদের অংশবিশেষ ভাঙা নিয়ে উত্তেজনা চলছে।

প্রশ্ন হলো, প্রায় ২০০ কোটি মুসলমানের প্রতিনিধিত্বকারী মুসলিম বিশ্ব কি কেবল বিবৃতি দিয়েই দায় সারবে? নাকি এমন কিছু কার্যকর পদক্ষেপ আছে, যা আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির কাঠামোর ভেতরে থেকে এই ঐতিহ্য রক্ষায় সত্যিকারের ভূমিকা রাখতে পারে? এই লেখা সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা।

প্রেক্ষাপট: ভাঙনের ধারাবাহিকতা
বাবরি মসজিদ থেকে উজ্জয়িন পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনায় কর্তৃপক্ষ ভিন্ন ভিন্ন কারণ দেখিয়েছে — কখনো ‘অবৈধ দখল’, কখনো ‘সড়ক প্রশস্তকরণ’, কখনো ‘আদালতের জরিপ’। কিন্তু ফলাফল একই: মুসলিম ঐতিহ্যের দৃশ্যমান চিহ্ন মুছে যাচ্ছে।

সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাটি মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে। প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো শাহী মসজিদের নামাজঘর ও মিনারের অংশ ভাঙার পরিকল্পনা করা হয়েছে ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভের জন্য সড়ক প্রশস্তকরণের নামে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শেষ দিকে এর প্রতিবাদে জড়ো হওয়া জনতার ওপর টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ করা হয়।

এর কয়েক সপ্তাহ আগে, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে একটি শতবর্ষী মসজিদ ভোরবেলা ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করে ভেঙে ফেলা হয়।

২০২৪ সালের নভেম্বরে উত্তর প্রদেশের সম্ভলে শাহী জামে মসজিদে আদালত নির্দেশিত জরিপকে ঘিরে সংঘর্ষে পাঁচজন মুসলমান নিহত হন। একই বছরের জানুয়ারিতে দিল্লির মেহরৌলিতে ৬০০ থেকে ৭০০ বছরের পুরোনো আখোনজি মসজিদ ‘অবৈধ দখল’ আখ্যা দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়, অথচ ১৯২০ সালেই মসজিদটি ভারতের প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগের ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় ছিল।

আর এই ধারাবাহিকতার সূচনাবিন্দু হিসেবে আজও মনে করা হয় ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরকে, যেদিন অযোধ্যার বাবরি মসজিদ উগ্র জনতার হাতে ধ্বংস হয় এবং পরবর্তী দাঙ্গায় প্রায় দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারান।

উজ্জয়িনে স্থানীয় মুসলমানদের অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছিল কেবল তিন ফুট ঝুলন্ত স্ল্যাব সরানোর, অথচ পরদিন বুলডোজার নিয়ে হাজির হয় কর্তৃপক্ষ। শহরের আরও কয়েকটি পুরোনো মসজিদ ঝুঁকিতে আছে বলে স্থানীয় আলেমরা আশঙ্কা করছেন।

জাতিসংঘে পাকিস্তানের অবস্থান ও ভারতের জবাব
পাকিস্তানই এখন পর্যন্ত বিষয়টি আন্তর্জাতিক মঞ্চে সবচেয়ে সোচ্চারভাবে তুলেছে। সাহারানপুরের ঘটনার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর একে ইসলামি ঐতিহ্য মুছে ফেলার বৃহত্তর অভিযানের অংশ আখ্যা দেয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে বিষয়টি আমলে নেওয়ার আহ্বান জানায়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ভারতে ধর্মীয় নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন।

মুসলিম বিশ্বের করণীয়

নিন্দা জানানো প্রথম ধাপ, শেষ ধাপ নয়। নিচের পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর ভেতরে থেকেই নেওয়া সম্ভব।

১. ওআইসিকে সক্রিয় করা। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক ডেকে ভারতের ঐতিহাসিক মসজিদ রক্ষায় একটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে। ওআইসির স্বাধীন স্থায়ী মানবাধিকার কমিশন প্রতিটি ঘটনার তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে।

২. ইউনেস্কো ও ঐতিহ্য আইনের পথ। ঐতিহ্য রক্ষা কেবল ধর্মীয় নয়, মানবসভ্যতার প্রশ্ন। মুসলিম দেশগুলো ইউনেস্কোতে যৌথভাবে দাবি তুলতে পারে, যাতে শত শত বছরের পুরোনো মসজিদগুলোকে বিপন্ন ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দেওয়া হয়।

৩. জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বহুপাক্ষিক উদ্যোগ। একক দেশের বক্তৃতার বদলে কয়েকটি দেশ মিলে ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ারের কাছে তদন্তের অনুরোধ জানাতে পারে। জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ মার্চের ‘ইসলামভীতি প্রতিরোধ দিবস’কে এ বিষয়ে বৈশ্বিক সচেতনতার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

৪. দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি ও অর্থনৈতিক প্রভাব। উপসাগরীয় দেশগুলো ভারতের বড় বাণিজ্য অংশীদার, জ্বালানি সরবরাহকারী এবং লাখো ভারতীয় প্রবাসী কর্মীর কর্মস্থল। শান্ত কিন্তু দৃঢ় কূটনৈতিক বার্তায় এই সম্পর্কের ওজন ব্যবহার করা নিন্দা বিবৃতির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

৫. ভারতের সাংবিধানিক ও আইনি লড়াইয়ে সহায়তা। ভারতের ১৯৯১ সালের উপাসনালয় আইন ১৯৪৭ সালের অবস্থান অনুযায়ী উপাসনালয়ের চরিত্র রক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। ভারতীয় মুসলিম সংগঠন ও মসজিদ কমিটিগুলোর আইনি লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ, গবেষক ও মানবাধিকার সংস্থার নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন জোরদার করা যায়।

৬. প্রামাণ্যকরণ ও ডিজিটাল আর্কাইভ। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ মসজিদের স্থাপত্য, শিলালিপি ও ইতিহাস ছবি, ভিডিও ও থ্রিডি স্ক্যানে সংরক্ষণ করা জরুরি। মুসলিম বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে এমন একটি উন্মুক্ত আর্কাইভ গড়ে তুলতে পারে।

৭. গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ। আবেগী প্রচারণার বদলে তথ্যনির্ভর, বহুভাষিক সাংবাদিকতা বিশ্বজনমত গঠনে বেশি কাজ করে। ভারতের ভেতরের ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসবিদ, স্থপতি ও নাগরিক সমাজ — যাঁরা নিজেরাও এসব ভাঙনের বিরোধিতা করছেন — তাঁদের কণ্ঠকে সামনে আনাই হবে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য কৌশল।

যা করা উচিত নয়

বাবরি ধ্বংসের পর পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর প্রতিশোধমূলক হামলা হয়েছিল — এটি ইতিহাসের এক লজ্জাজনক অধ্যায়। নিজ দেশের নিরপরাধ সংখ্যালঘুর মন্দির বা বসতিতে আঘাত করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী, এবং তা ভারতের উগ্রপন্থীদের হাতেই নতুন যুক্তি তুলে দেয়।

একইভাবে, গুজব ও যাচাইহীন ভিডিও ছড়ানো আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। মসজিদ রক্ষার দাবি যত বেশি ন্যায়, শান্তিপূর্ণ ও তথ্যনির্ভর থাকবে, বিশ্বের কাছে তা তত বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।

উপসংহার
একটি মসজিদ কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এটি একটি জনপদের স্মৃতি, স্থাপত্যের ইতিহাস এবং বহু প্রজন্মের ইবাদতের সাক্ষী। জাতিসংঘের মঞ্চে নিন্দা জানানো জরুরি ছিল, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

মুসলিম বিশ্বের সামনে এখন কাজ তিনটি: ঐক্যবদ্ধ বহুপাক্ষিক কূটনীতি, আইন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের পথে ধারাবাহিক উদ্যোগ, এবং নিজের ঘরে ধর্মীয় সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত স্থাপন। আবেগ নয়, প্রজ্ঞা ও ধারাবাহিকতাই পারে এই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp