চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার হয়ে কুনমিং: চীনের সঙ্গে সরাসরি সড়কপথের প্রস্তাব বাংলাদেশের
চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং পর্যন্ত সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সফররত ইউনানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এ প্রস্তাব তোলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ইউনানের এক্সিকিউটিভ ভাইস গভর্নর ঝাও জুনমিনের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি এই বৈঠকে অংশ নেয়।
২৪ ঘণ্টায় পণ্য পরিবহনের নতুন দিগন্ত:
বাণিজ্যমন্ত্রীর মতে, চট্টগ্রাম থেকে কুনমিং পর্যন্ত প্রায় ১,২০০ কিলোমিটারের একটি কার্যকর সড়ক তৈরি করা গেলে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে। এতে সময় ও খরচ—দুটোই লক্ষণীয়ভাবে কমে আসবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের মধ্যবর্তী বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় (সাপ্লাই চেইন) নতুন গতি সঞ্চার হবে।
ইউনানকে বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রদেশটির প্রায় ৪ কোটি ৬৪ লাখ মানুষের কাছে বাংলাদেশি পণ্য সহজে পৌঁছে দিতে প্রস্তাবিত শুল্কমুক্ত ‘বন্ডেড ওয়্যারহাউস’ ও প্রদর্শনী সুবিধা দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও সুবিধাসমূহ:
বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও ইউনানের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১.৩ বিলিয়ন ইউয়ান অতিক্রম করেছে। ঝাও জুনমিন উল্লেখ করেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ইউনানের বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা নীতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশি পণ্যের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউস, বিশেষ প্রদর্শনী কেন্দ্র ও শুল্ক সংক্রান্ত নানা সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা শিগগিরই কার্যকর হবে।
ইতোমধ্যে ইউনানের বাণিজ্য বিভাগ ও বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে পণ্য প্রদর্শনের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। ঝাও জুনমিন এই সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।
আকাশপথের সংযোগ ও কৃষিপণ্য বাণিজ্য:
সড়কপথের পাশাপাশি সরাসরি কার্গো বিমান চালুর বিষয়েও উভয় পক্ষ গুরুত্বারোপ করে। বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, হিমায়িত মাছ এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্য ইউনানে রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ইউনান থেকে ফুল, সার ও পশুখাদ্য আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট চালু হলে পচনশীল কৃষিপণ্য বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
গবেষণা, বিনিয়োগ ও সিলেটে কুনমিং ধাঁচের পার্ক:
বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি বাণিজ্যমন্ত্রী কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন:
•যৌথ গবেষণা: পাটের গুণগত মান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে যৌথ গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন।
•প্রযুক্তি ও জ্বালানি: জ্বালানি, ই-কমার্স ও প্রযুক্তি খাতে উভয় দেশের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি।
•বিনিয়োগ: বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বিশেষত ইউনানের নারী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা।
•সিলেটে পার্ক নির্মাণ: কুনমিংয়ের আধুনিক পার্কের আদলে সিলেটের পুরোনো কারাগারের জায়গায় একটি পার্ক নির্মাণে ইউনানের কারিগরি সহযোগিতা।
প্রতিনিধিদলের প্রধান ঝাও জুনমিন প্রস্তাবগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে আখ্যায়িত করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও যোগাযোগ বৃদ্ধিতে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। বৈঠকে বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনসহ উভয় দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সামগ্রিকভাবে, মিয়ানমার অংশের অবকাঠামো, নির্মাণ ব্যয় কিংবা নির্ধারিত সময়সীমা নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও, প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তাবিত বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও প্রদর্শনী সুবিধা কার্যকর হলে ইউনানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার অনেকটাই সহজ হবে।