বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক বা অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তবে সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থীর নিয়োগ আটকে যাওয়ায় বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ই এখনো চাকরি পাওয়ার প্রধান নিয়ামক?
হতাশা থেকে রাজপথ: যেভাবে দানা বাঁধল ক্ষোভ
সব প্রক্রিয়া শেষ করে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও নিয়োগপত্র পাননি শত শত চাকরিপ্রত্যাশী। বাধ্য হয়ে তারা রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের মূল অভিযোগ, ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার স্পষ্ট বা যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ তাদের জানানো হয়নি। এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীরা জানান, প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার চূড়ান্ত প্রার্থীর মধ্যে অন্তত দুই হাজার প্রার্থীর নিয়োগপত্র ইস্যু করা হয়নি। গত ১ অক্টোবর থেকে অন্য প্রার্থীরা কর্মস্থলে যোগ দিলেও এই দুই হাজার তরুণের ভবিষ্যৎ এখনো চরম অনিশ্চয়তায় ঝুলছে।
এই ইস্যুতে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি এ সিদ্ধান্তকে "ফ্যাসিবাদী আচরণেরই পুনরাবৃত্তি" বলে মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাদ পড়া বেশিরভাগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। কেবল অনুমানের ভিত্তিতে বা রাজনৈতিক পরিচয় টেনে তাদের বাদ দেওয়া সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমতার অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি অবিলম্বে বাদ পড়ার স্পষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা এবং ভুক্তভোগীদের আপিল করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবাদের ঝড়
অনিয়মের এই অভিযোগ কেবল চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'জাতীয় ছাত্রশক্তি' ব্যানারে "রেড কার্ড টু বিএনপিজম" শীর্ষক কর্মসূচি পালিত হয়। তারা সরকারের কাছে দুটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেছে—ভেরিফিকেশনের নামে বাদ পড়া যোগ্য প্রার্থীদের দ্রুত নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে কাউকে সুবিধা বা বঞ্চনা দেওয়ার অপসংস্কৃতি বন্ধ করা। ছাত্রনেতাদের অভিযোগ, বর্তমান ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততাই যেন এখন চাকরি পাওয়ার প্রধান যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন করেছে জকসু ও ছাত্রশক্তি। তাদের প্রশ্ন—ভেরিফিকেশনের অজুহাতে রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হচ্ছে কি না, তা প্রশাসনকে স্পষ্ট করতে হবে। এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)-সহ একাধিক শিক্ষার্থী প্ল্যাটফর্ম থেকে একই ধরনের প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
ব্রিটিশ আমলের প্রথা ও বর্তমান বাস্তবতা
সরকারি চাকরিতে পুলিশ ভেরিফিকেশনের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯২০-এর দশকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী মূলত তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত বিপ্লবীদের চেনার জন্য এবং চাকরিতে তাদের প্রবেশ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে এই প্রথা চালু করেছিল। সময় বদলেছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু প্রথাটি রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য আরও কলুষিত হয়েছে—এটি এখন বিরোধী মত দমনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সম্প্রতি গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন—উভয়ই এই পুরোনো ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ তুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছে। তাদের যুক্তি স্পষ্ট: চাকরি বা পাসপোর্টের ক্ষেত্রে প্রার্থীর নিজস্ব কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড আছে কি না, তা যাচাই করাই যথেষ্ট। প্রার্থীর আত্মীয়স্বজন বা পরিবারের রাজনৈতিক মতাদর্শ বিবেচনায় নেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। অন্যদিকে, সাবেক আইজিপি নূরুল হুদার মতে, ভেরিফিকেশন পুরোপুরি বন্ধ না করে এর মধ্যকার দীর্ঘসূত্রিতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দূর করাই বাস্তবসম্মত। পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যভাণ্ডার যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি সহজ করার প্রস্তাবও উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে সমস্বরে দাবি
ছাত্রদের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও চাকরিতে দলীয়করণের বিষয়ে সোচ্চার হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক কর্মী সম্মেলনে অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এখনো দলীয় বলয় তৈরি করে রাখা হয়েছে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করে সরকারি দপ্তরগুলোকে অবিলম্বে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
মূল সংকট যেখানে
সব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে একটিই মৌলিক প্রশ্ন—আমাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ? প্রশাসনিক নিরাপত্তা ও তথ্যের সঠিকতা যাচাইয়ের প্রয়োজন নিশ্চয়ই আছে, তবে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা, অনাকাঙ্ক্ষিত দেরি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এর ব্যবহার পুরো ব্যবস্থাটিকেই বিতর্কিত করে তুলেছে। চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের দাবি একেবারেই সাধারণ ও যৌক্তিক: কাউকে বাদ দিলে তার স্পষ্ট কারণ জানাতে হবে, ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ দিতে হবে এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল মেধা ও যোগ্যতাকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে।