থ্রি আর কৌশলে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের রূপরেখা

থ্রি আর কৌশলে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের রূপরেখা
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি রূপরেখা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্ক সময় ২৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া ভাষণটি বাংলাদেশ সময় ২৫ সেপ্টেম্বর ভোরে সম্প্রচারিত হয়। এতে তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে সরকারের ‘থ্রি-আর’—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন—কৌশলের কথা তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালে দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন ও শোষণের অবসানের পর বাংলাদেশ আবার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। গুম, হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের মতো সংকট থেকে বেরিয়ে দেশকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই সরকার তিনটি পরস্পরসম্পর্কিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
রিকভারি বা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য হলো অর্থনীতিকে সচল করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের বৃহৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা। রেস্টোরেশন বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আওতায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর রিকনস্ট্রাকশন বা পুনর্গঠন পর্যায়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার ভিত্তিতে একটি নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

তরুণদের দক্ষতা ও স্টার্টআপ

দেশের বৃহৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক সুবিধায় রূপান্তরকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের কথা ভাষণে উল্লেখ করা হয়।

নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরের প্রতিটি পর্যায়ে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারীদের জন্য নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করতে নারীপ্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’, ‘স্পোর্টস কার্ড’ এবং ‘ই-হেলথ কার্ড’-এর মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথাও ভাষণে উঠে আসে।
ভবিষ্যতে বিভিন্ন খাতের এসব কার্ডকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় এনে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও প্রধানমন্ত্রী জানান। তাঁর ভাষায়, লক্ষ্য শুধু নির্বাচনী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়; অর্থনীতিরও গণতন্ত্রীকরণ, যাতে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়।

৩১ দফা ও এসডিজি

নির্বাচনের আগে দেওয়া বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর ৭৩ শতাংশ কার্যক্রম সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ পরোক্ষভাবে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি জানান, এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো শহর ও গ্রামের উন্নয়নবৈষম্য কমানো, জবাবদিহি বাড়ানো এবং ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ নীতির ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়াকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষা খাতে দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কারিগরি ও বাস্তবমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে কর্মসংস্থানমুখী ও নৈতিকতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও তিনি জানান। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ, পোশাক ও বিনামূল্যে মধ্যাহ্নভোজ দেওয়ার কর্মসূচির কথাও ভাষণে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষাক্রমে খেলাধুলাকে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগের কথা জানান তিনি।

প্রযুক্তি বৈষম্য ও এলডিসি উত্তরণ

প্রযুক্তির অসম প্রবেশাধিকার নিয়ে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের ডিজিটাল বৈষম্য যেন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বৈষম্যে পরিণত না হয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি শ্রেণি থেকে উত্তরণকে টেকসই করতে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে নিশ্চিত অর্থায়ন, বৃহত্তর বাজারসুবিধা, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।

রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তন

ভাষণে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা দাবি করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ওপর জোর দেন।

বাংলাদেশে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল পুনঃখননের পরিকল্পনার কথাও ভাষণে তুলে ধরা হয়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের অঙ্গীকার

ভাষণের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী এমন একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভর, কল্যাণমুখী ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার করেন, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে, সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে।

তিনি বলেন, তরুণরা যেন ভয় ও বাধা ছাড়াই নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে, নারীরা যেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে এবং প্রতিটি শিশু যেন নিজের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়—সরকার সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়।

ভাষণের শেষাংশে তিনি সরকারের অঙ্গীকারকে সংক্ষেপে তুলে ধরেন: “বাংলাদেশ প্রথম: সবার জন্য বাংলাদেশ।”
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp