জলবায়ু ন্যায়বিচারে বিশ্বনেতাদের কার্যকর ঐক্যের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

জলবায়ু ন্যায়বিচারে বিশ্বনেতাদের কার্যকর ঐক্যের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ—অথচ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে দেশটির অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। এই ঐতিহাসিক বৈষম্য তুলে ধরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিশ্বনেতাদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট জানান, একক কোনো দেশের পক্ষে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রকৃত ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর (বুধবার) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু সংকটের পেছনে যাদের দায় সবচেয়ে কম, দুর্ভাগ্যবশত পরিণতি ভোগ করতে গিয়ে তারাই আজ সবচেয়ে বেশি চড়া মূল্য দিচ্ছে।

পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে ত্বরান্বিত করে। চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১২ থেকে ১৮ শতাংশ এলাকা জলমগ্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তা। বর্তমানে প্রতি বছর জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে গিয়ে দেশের জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতার নিরিখে চলতি অর্থবছরের বাজেটে অভিযোজন খাতে প্রায় ৩.১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ রাখা হলেও, আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া এ লড়াই দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা কঠিন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তবে সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ যে কেবল বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল নয়, সেটিও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন তিনি। দেশের অভ্যন্তরে পরিবেশ রক্ষায় নেওয়া একাধিক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাভূমি পুনরুজ্জীবন ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎস জোরদারে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখনন করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজের মতো মহাপরিকল্পনা।

বিদ্যুৎ খাতেও রূপান্তরের ছোঁয়া লাগছে—২০৩০ সালের মধ্যে মোট চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের প্রসার, সবুজ পরিবহন ব্যবস্থা, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং একটি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার কাজ দৃশ্যমান গতিতে এগোচ্ছে।

তবে এসব স্থানীয় উদ্যোগ যে সামগ্রিক সংকট দূর করতে পর্যাপ্ত নয়, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতা’ (CBDR-RC) নীতির ওপর জোর দেন। বিশ্বনেতাদের সামনে তিনি ৫টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেন:

১. উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণ: প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখতে বিশ্বজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত হ্রাস করা।
২. সহজলভ্য অর্থায়ন: জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন খাতের অর্থায়নকে কাগুজে প্রতিশ্রুতি থেকে বের করে পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য করা।
৩. প্রযুক্তিগত প্রবেশাধিকার: উদ্ভাবনী প্রযুক্তি সহজলভ্য করে একটি সুষম ও ন্যায়ভিত্তিক ‘ক্লাইমেট ট্রানজিশন’ নিশ্চিত করা।
৪. নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিস্তার: সহজ শর্তে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো।
৫. ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ফান্ড সক্রিয়করণ: জলবায়ুজনিত ক্ষতিপূরণ (Loss and Damage) তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং এতে নিয়মিত অর্থপ্রবাহ বজায় রাখা।

বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক জলবায়ু অংশীদারিত্ব কেবল দয়া বা সহানুভূতির বিষয় নয়, বরং এটি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রাপ্য অধিকার ও ন্যায়বিচারের স্বীকৃতি।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp